কল্পনা করুন আপনি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে বিশাল বিশাল পাথরের স্তম্ভ আকাশ ফুঁড়ে ওপরে উঠে গেছে আর মেঘের ভেলা সেই পাহাড়গুলোর মাঝখান দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন পাহাড়গুলো মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই বরং শূন্যে ভেসে আছে। এটি কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভির দৃশ্য নয় বরং চীনের হুনান প্রদেশের ঝাংজিয়াজি ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্কের বাস্তব চিত্র। জেমস ক্যামেরনের অ্যাভাটার মুভিটি যারা দেখেছেন তারা প্যান্ডোরা গ্রহের সেই ঝুলন্ত পাহাড়গুলোর কথা নিশ্চিতভাবে মনে রেখেছেন। অনেকেরই ধারণা ছিল সেই পাহাড়গুলো হয়তো পুরোপুরি কম্পিউটার গ্রাফিক্সের কারসাজি কিন্তু ঝাংজিয়াজির এই অরণ্যই ছিল সেই কাল্পনিক হ্যালুয়ালুয়া মাউন্টেনস তৈরির আসল ইনস্পিরেশন। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই অবিশ্বাস্য যে মানুষের চোখ একে বাস্তব বলে মেনে নিতে দ্বিধা করে।
এই পাহাড়গুলোর জন্ম রহস্য আজ থেকে প্রায় ৩৮০ মিলিয়ন বছর আগের। সেই সময়ে এই পুরো অঞ্চলটি ছিল একটি বিশাল সমুদ্রের তলদেশ। সমুদ্রের পানির নিচে কয়েক কোটি বছর ধরে কোয়ার্টজ স্যান্ডস্টোন বা স্ফটিকযুক্ত বেলেপাথরের স্তর জমতে থাকে। পরবর্তীতে পৃথিবীর টেকটোনিক মুভমেন্ট বা ভূ-তাত্ত্বিক নড়াচড়ার কারণে সমুদ্রের তলদেশ ওপরে উঠে আসে আর বিশাল এক মালভূমি তৈরি হয়। শুরু হয় প্রকৃতির নিপুণ খোদাইয়ের কাজ যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ইরোশন বা ক্ষয় ভবন। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বৃষ্টি, বাতাস এবং বরফ জমার ফলে বেলেপাথরের নরম অংশগুলো ক্ষয়ে গিয়ে সরু এবং লম্বাটে পিলারের মতো আকৃতি ধারণ করেছে। এখানে প্রায় তিন হাজারের বেশি এমন পাথুরে স্তম্ভ রয়েছে যার কোনো কোনটি উচ্চতায় এক কিলোমিটারের চেয়েও বেশি। এই অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ ১৯৯২ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায়।
চীনের ঝাংজিয়াজিয়ে ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্কে কুয়াশাচ্ছন্ন বনের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাথুরে স্তম্ভ। ছবি: আজানা। |
পর্যটকদের জন্য এই জায়গাটি যেমন সৌন্দর্যের আধার তেমনই এক রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের কেন্দ্রবিন্দু। ঝাংজিয়াজিতে পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হলো বেইলং এলিভেটর যা পৃথিবীর সবথেকে উঁচুতে অবস্থিত আউটডোর লিফট। এই লিফটে চড়ে যখন আপনি পাহাড়ের গা বেয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার ফুট ওপরে উঠে যাবেন তখন মনে হবে আপনি মেঘের রাজ্য জয় করতে যাচ্ছেন। লিফটের স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল দিয়ে বাইরের ভিউ দেখা শরীরের অ্যাড্রেনালিন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। উচ্চতা ভীতি যাদের নেই তাদের জন্য এটি পৃথিবীর সেরা এক্সপেরিয়েন্সগুলোর একটি হতে পারে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন নিচ দিকে তাকানো হয় তখন পায়ের নিচে বিশাল অরণ্য আর মেঘের লুকোচুরি খেলা এক অপার্থিব ভালো লাগার জন্ম দেয়।
পাহাড়ের মাঝে বেইলং এলিভেটর। ছবি: টিকিট। |
গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন গ্লাস ব্রিজ। ছবি: ওয়েস্টচাইনাগো। |