আকাশ থেকে যখন অ্যামাজন রেইনফরেস্টের দিকে তাকানো হয় তখন তা দেখতে একটি বিশাল, অবিচ্ছিন্ন সবুজ সমুদ্রের মতো মনে হয়। দক্ষিণ আমেরিকার নয়টি দেশের ওপর বিস্তৃত এই জঙ্গল কেবল পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রান্তীয় বন নয়, এটি জীববৈচিত্র্যের এক অবিশ্বাস্য ভাণ্ডার। প্রায় পাঁচ কোটি হেক্টর জুড়ে থাকা এই জঙ্গলটি ঐতিহাসিকভাবেই পৃথিবীর 'ফুসফুস' নামে পরিচিত। এই নামকরণ এত জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো একটি বহুল প্রচলিত ধারণা যে এই জঙ্গল বিশ্বের মোট অক্সিজেনের কুড়ি শতাংশ সরবরাহ করে এবং আমরা সেই অক্সিজেন গ্রহণ করে বেঁচে থাকি। যদিও এই ধারণাটি কিছুটা সরলীকৃত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যায় এর কিছু ভিন্নতা আছে, তবুও অ্যামাজনকে পৃথিবীর ফুসফুস ডাকার পেছনে শক্তিশালী এবং যৌক্তিক কারণ রয়েছে যা বৈশ্বিক জলবায়ু বা গ্লোবাল ক্লাইমেট নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
অ্যামাজন জঙ্গলকে ফুসফুস বলার কারণ এর ফটোপালস প্রক্রিয়া বা সালোকসংশ্লেষণ ক্ষমতা। গাছপালা সূর্যালোকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে। বিপুল সংখ্যক গাছের সম্মিলিতভাবে এই প্রক্রিয়া চালানোর ফলে অ্যামাজন দৈনিক বিপুল পরিমাণে অক্সিজেন উৎপাদন করে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এবং নাসা-র গবেষকরা এখন জোর দিয়ে বলছেন যে অ্যামাজন যে পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন করে প্রায় সমপরিমাণ অক্সিজেন সে নিজেই রাতে এবং অন্যান্য সময়ে শ্বসন বা রেস্পিরেশন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে নেয়। এছাড়া এই জঙ্গলে যখন কোনো গাছ মারা যায় বা পচে যায় তখন সেই পচন প্রক্রিয়া এবং অনুজীবেরা অক্সিজেন ব্যবহার করে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে। ফলে সামগ্রিকভাবে হিসাব করলে অ্যামাজন জঙ্গলের নিট অক্সিজেন উৎপাদন বা নেট অক্সিজেন প্রোডাকশন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। অর্থাৎ, আমরা যে শ্বাস নিই, সেই অক্সিজেনের বেশিরভাগই আসে মূলত সমুদ্রের প্লাঙ্কটন থেকে, অ্যামাজন থেকে নয়।
আমাজন নদী অববাহিকা। ছবি: নীল পালমার। |
তাহলে কেন এর ধ্বংস নিয়ে এত উদ্বেগ? এর আসল গুরুত্ব অক্সিজেনের উৎপাদনে নয়, বরং এর কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের ক্ষমতায়। অ্যামাজন পৃথিবীর বৃহত্তম কার্বন সিঙ্ক বা কার্বন শোষক যন্ত্র হিসেবে কাজ করে। পরিবেশ থেকে বিশাল পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড টেনে নিয়ে এর কাণ্ড, পাতা, শিকড় এবং মাটিতে জমিয়ে রাখে। এটি পরিবেশ থেকে গ্রীনহাউস গ্যাস টেনে নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বা ক্লাইমেট চেঞ্জ এর গতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই জঙ্গল তার ভেতরে প্রায় দেড়শো বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড মজুত করে রেখেছে। যখন অ্যামাজন ধ্বংস করা হয়, তা হয় গাছ কেটে বা আগুন লাগিয়ে, তখন দুটি মারাত্মক ঘটনা একসঙ্গে ঘটে। প্রথমত, গাছগুলো মরার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের শরীরে সঞ্চিত থাকা বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড আবার বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয়। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নেওয়ার ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
অ্যামাজনের এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়াটি যদি চলতে থাকে তবে এর ভয়াবহতা বৈশ্বিক অক্সিজেন সরবরাহের চেয়েও বেশি হবে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে অতিরিক্ত বন উজাড় বা ডিফরেস্টেশনের কারণে অ্যামাজনের নিজস্ব জলচক্র বা ওয়াটার সাইকেল ভেঙে পড়বে। গাছপালা যে আর্দ্রতা তৈরি করে তা বৃষ্টি আকারে ফিরে আসে, কিন্তু সেই আর্দ্রতা কমে গেলে বৃষ্টিপাত কমে যাবে এবং জঙ্গলটি ক্রমশ শুষ্ক হতে শুরু করবে। এটি জঙ্গলটিকে দাবানলের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে এবং একসময় এটি ট্রপিক্যাল ফরেস্ট বা ক্রান্তীয় বন থেকে সাওয়ানা বা শুষ্ক তৃণভূমিতে পরিণত হতে পারে। এই পরিবর্তন ঘটলে অ্যামাজন আর কার্বন শোষণ করবে না বরং এটি নিজে একটি কার্বন উৎস বা কার্বন সোর্স হিসেবে কাজ করবে যা বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত গ্রীনহাউস গ্যাস যোগ করে বৈশ্বিক উষ্ণতাকে তীব্রভাবে বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলার হার বাড়বে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে।
১৬ আগস্ট ২০২০-এ পারা অঙ্গরাজ্যের নোভো প্রোগ্রেসোর দক্ষিণে আমাজন রেইনফরেস্ট সংরক্ষিত এলাকার জ্বলতে থাকা অংশের আকাশ থেকে তোলা দৃশ্য। ছবি: কার্ল দে সৌজা। |
তাই অ্যামাজনকে পৃথিবীর ফুসফুস বলার মূল কারণ হলো এর শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা, অর্থাৎ পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড টেনে নেওয়ার ক্ষমতা। এই শোষণের মাধ্যমে অ্যামাজন আমাদের ভবিষ্যতের বাতাসকে সুরক্ষিত রাখে। এর ধ্বংস সরাসরি আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নিঃশেষ করে দেবে না, কিন্তু এটি জলবায়ু পরিবর্তনের এমন এক বিপর্যয়কর ধাপ শুরু করবে যা খাদ্য নিরাপত্তা, সমুদ্রের স্তর এবং আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতা সৃষ্টি করে পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রাণের টিকে থাকাকেই অসম্ভব করে তুলবে। অ্যামাজনের এই সবুজ ঢাল হারিয়ে গেলে প্রকৃতি আর মানুষের তৈরি কার্বনের বোঝা বহন করতে পারবে না। তাই অ্যামাজনকে রক্ষা করা মানে কেবল পরিবেশ রক্ষা করা নয়, এটি আসলে আমাদের গ্রহের ভবিষ্যতের জলবায়ু এবং জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করার একমাত্র নিশ্চিত উপায়।