হরের কংক্রিটের জঙ্গলে আমরা হয়তো বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করে বাইরের দূষণ থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করি কিন্তু ঘরের ভেতরের বাতাসও যে মারাত্মকভাবে দূষিত হতে পারে তা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। ঘরের দেয়ালের পেইন্ট, নতুন আসবাবপত্র, কার্পেট এবং বিভিন্ন পরিষ্কার করার রাসায়নিক পদার্থ থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত হয় ভোল্টাইল অরগানিক কম্পাউন্ড বা ভিওসিএস (VOCs) নামের ক্ষতিকর গ্যাস। ফর্মালডিহাইড এবং বেনজিনের মতো এই অদৃশ্য বিষাক্ত উপাদানগুলো আমাদের স্বাস্থ্য ও মানসিক শান্তিকে নীরবে প্রভাবিত করে। ঠিক এই সময়েই আমাদের পরিত্রাতা হয়ে আসে ঘরের কোণে থাকা সাধারণ একটি ইনডোর প্ল্যান্ট বা গৃহস্থালি গাছ। এই সবুজ বন্ধুটি কেবল আমাদের ঘরের সৌন্দর্যই বাড়ায় না বরং এক নিঃশব্দ রাসায়নিক ল্যাবরেটরির মতো কাজ করে বাতাসকে বিশুদ্ধ করে এবং আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই বাতাস পরিশোধনের প্রক্রিয়াটি প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে নাসা বা ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। নাসা ক্লিন এয়ার স্টাডি নামের এই বিখ্যাত গবেষণায় দেখা যায় কিছু বিশেষ ইনডোর প্ল্যান্ট বদ্ধ পরিবেশে থাকা ক্ষতিকারক ভিওসিএস টেনে নিতে পারে। আমরা সাধারণত মনে করি যে গাছ কেবল সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার জন্য কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে। কিন্তু এই গাছগুলো তাদের পাতার স্টোমাটা বা রন্ধ্রের মাধ্যমে বাতাস থেকে ফর্মালডিহাইড এবং ট্রাইক্লোরোইথিলিনের মতো বিষাক্ত গ্যাস শোষণ করে নেয়। এটি হলো প্রথম ধাপ। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি ঘটে গাছের মূল বা শিকড়ে। পাতা দ্বারা শোষিত হওয়ার পর বিষাক্ত পদার্থগুলো শিকড়ে স্থানান্তরিত হয়। শিকড়ের চারপাশে থাকা ব্যাকটেরিয়া বা মাইক্রোবগুলো এই বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদানগুলোকে ভেঙে নিজেদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেগুলোকে নিরাপদ উপাদানে রূপান্তরিত করে। এইভাবে শিকড়ের ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রাকৃতিকভাবে বাতাসকে ফিল্টার করে দেয়।

সবুজ পাতায় ভরে আছে ঘর, জানালার আলোয় প্রাণের উচ্ছ্বাস।
ছবি: আজানা।

ইনডোর প্ল্যান্টের উপস্থিতি শুধু শরীরের ভেতরের বায়ুকেই পরিষ্কার করে না বরং আমাদের মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরেও এর এক গভীর ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বিজ্ঞানীরা একে বায়োফিলিয়া হাইপোথিসিস বা প্রকৃতির প্রতি মানুষের সহজাত টান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কাজের ডেস্কের পাশে বা বসার ঘরে সবুজের উপস্থিতি আমাদের স্ট্রেস বা চাপ কমাতে জাদুকরী ভূমিকা নেয়। গবেষণা বলছে, গাছপালা আমাদের শরীরে কোর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে। একটি হাসপাতালে যখন কোনো রোগী তাদের ঘরের ভেতরে বা পাশে গাছ দেখতে পায় তখন তাদের দ্রুত আরোগ্য লাভের হার তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। এর কারণ হলো গাছ আমাদের মনকে শান্ত করে, উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি কমায় এবং এক ধরনের প্রাকৃতিক প্রশান্তি এনে দেয়।

গাছপালা আমাদের মনোযোগ বা কনসেন্ট্রেশন বাড়াতেও অত্যন্ত কার্যকরী। ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে যেসকল অফিসে বা শ্রেণিকক্ষে গাছপালা থাকে সেখানকার কর্মীরা বা শিক্ষার্থীরা কোনো কাজে দীর্ঘ সময় ধরে মনোনিবেশ করতে পারে এবং তাদের মেজাজও ভালো থাকে। এই সবুজ রঙ এবং প্রকৃতির শান্তিময়তা আমাদের মস্তিষ্ককে দ্রুত ক্লান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। এটি আমাদের মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে এবং সৃজনশীলতা বা ক্রিয়েটিভিটি বাড়াতেও সাহায্য করে। স্নেক প্ল্যান্ট বা স্যান্সেভিয়েরিয়া, স্পাইডার প্ল্যান্ট এবং মানি প্ল্যান্টের মতো কিছু জনপ্রিয় গাছ যেমন তাদের বাতাস পরিশোধনের ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত তেমনই তাদের যত্ন নেওয়া বা কেয়ারিং প্রসেসটাও এক ধরনের থেরাপির মতো কাজ করে। গাছের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা, তাকে জল দেওয়া এই রুটিনগুলো মানুষের মধ্যে এক ধরনের দায়িত্ববোধ জাগায় এবং তাদের মানসিক সংযোগকে শক্তিশালী করে।

এছাড়াও শীতকালে যখন ঘরের ভেতর হিটিং সিস্টেমের কারণে বাতাস খুব শুষ্ক হয়ে যায় তখন ইনডোর প্ল্যান্টগুলো নিজেদের পাতা থেকে আর্দ্রতা ছেড়ে দিয়ে বাতাসকে আর্দ্র বা হিউমিডিফাই করতে সাহায্য করে। এই আর্দ্র বাতাস আমাদের ত্বক এবং শ্বাসযন্ত্রের জন্য উপকারী। একটি ইনডোর প্ল্যান্ট হলো প্রকৃতির পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক ক্ষুদ্র উপহার যা নিরবে ঘরের ভেতরের পরিবেশকে বাসযোগ্য করে তোলে। এটি কেবল আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য বিশুদ্ধ বাতাস তৈরি করে না বরং আমাদের নিউরো-কেমিক্যাল বা স্নায়ু-রাসায়নিক স্তরে পরিবর্তন এনে আমাদের মনকে স্থির, শান্ত ও কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে। এই সবুজ বন্ধুরা প্রমাণ করে যে স্বাস্থ্য এবং প্রশান্তির জন্য আমাদের অনেক জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই বরং প্রকৃতির সহজ সরল সমাধানই যথেষ্ট।