মুদ্রের গভীর নীল জলরাশিতে বা গ্রীষ্মের ঝলমলে সকালে সাগরের উপকূলে এমন এক দৃশ্য দেখা যায় যা মনকে মুগ্ধ করে তোলে। হাজার হাজার, কখনও কখনও লক্ষ লক্ষ মাছ একসঙ্গে দল বেঁধে এমন নিখুঁত ও দ্রুত গতিতে চলাচল করে যে দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন জলজ প্রাণী নয় বরং একটি বিশাল আকারের একক জীব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই দলবদ্ধ চলনকে বিজ্ঞানের ভাষায় স্কুলিং বলা হয়। টুনা, সার্ডিন বা অ্যাঙ্কোভির মতো ছোট মাছেরা যখন একসঙ্গে তীব্র গতিতে দিক পরিবর্তন করে তখন সেই সম্মিলিত আন্দোলন একটি তরল মেঘ বা এক বিশাল ঝাড়ুদার ঢালের মতো দেখায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো একটি কেন্দ্রীয় নেতা বা মস্তিষ্ক ছাড়া এই বিশাল দল কীভাবে এত নিখুঁতভাবে একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা না খেয়ে চলে? কে দেয় নির্দেশনা? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মাছের শরীরের এক বিশেষ সংবেদনশীল অঙ্গ এবং পদার্থবিজ্ঞানের সহজ কিছু নিয়মের মধ্যে।

এই স্কুলিং এর প্রথম রহস্য হলো কোনো নেতৃত্ব নেই। এটি কোনো সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজ নয় যেখানে একজন কমান্ডার নির্দেশ দেন। বরং এটি একটি বিকেন্দ্রীভূত বা ডিসেন্ট্রালাইজড পদ্ধতি যেখানে প্রতিটি মাছ তার নিকটতম প্রতিবেশীর ওপর ভিত্তি করে নিজেদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। এই সমন্বয়ের প্রধান চাবিকাঠি হলো ল্যাটারাল লাইন বা পার্শ্বরেখা। এটি মাছের শরীরের দুপাশে থাকা এক বিশেষ সংবেদনশীল অঙ্গ যা মানুষের ইন্দ্রিয়গুলোর বাইরে এক অতিরিক্ত ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হিসেবে কাজ করে। ল্যাটারাল লাইন মূলত ছোট ছোট ছিদ্র বা পোরস এর একটি সারিতে গঠিত যার নিচে থাকে স্নায়ু কোষ। এই কোষগুলো জলের চাপ বা ওয়াটার প্রেসারের সামান্যতম পরিবর্তনও অনুভব করতে পারে। যখন কোনো মাছ নড়াচড়া করে তখন তারা জলে এক ধরনের ক্ষুদ্র তরঙ্গ তৈরি করে। এই তরঙ্গ বা চাপ যখন পাশের মাছের ল্যাটারাল লাইনে আঘাত করে তখন সেই মাছটি বুঝতে পারে যে তার প্রতিবেশী মাছটি কত দ্রুত চলছে বা কোন দিকে ঘুরছে। এই অবিরাম ফিডব্যাক সিস্টেমের কারণে তারা সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে নিজেদের গতি ও অবস্থান পরিবর্তন করে সংঘর্ষ এড়াতে পারে।

সমুদ্রের নিচে রূপালি রঙের অসংখ্য মাছ একসাথে দলবদ্ধভাবে সাঁতার কাটছে।
ছবি: আজানা।

ল্যাটারাল লাইনের পাশাপাশি মাছেরা তাদের চোখ বা দৃষ্টিশক্তির ওপরও নির্ভর করে। একটি মাছ তার কাছাকাছি থাকা মাছগুলোর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখে। এই দূরত্বটি সাধারণত মাছটির নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়। তারা তাদের প্রতিবেশীর গতিবিধি লক্ষ্য করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়। যদি সামনে থাকা মাছটি হঠাৎ ডান দিকে বেঁকে যায় তবে পেছনের মাছটিও চোখের পলকে একই দিকে বেঁকে যায়। এই সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া এতটাই দ্রুত হয় যে পুরো দলটির গতিপথ একযোগে পরিবর্তিত হয়। এই স্কুলিং এর প্রধান সুবিধা হলো সুরক্ষা। সমুদ্রের গভীরে টুনা, হাঙ্গর বা সামুদ্রিক পাখির মতো প্রেডেটর বা শিকারী প্রাণীরা সব সময়ই এই ছোট মাছগুলোর খোঁজে থাকে। যখন একটি ছোট মাছ একা থাকে তখন সে শিকারীর সহজ লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মাছ একসঙ্গে দল বেঁধে চললে শিকারীর পক্ষে একটি মাছকে আলাদা করে চিনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ডাইলুশন এফেক্ট বা লঘুকরণ প্রভাব বলা হয়। বিশাল দলটিকে দেখে শিকারী দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং দলটির সম্মিলিত ঘূর্ণন বা আকার পরিবর্তন শিকারীর সেন্সরি ওভারলোড বা সংবেদনশীলতায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

সুরক্ষার বাইরেও স্কুলিং এর আরেকটি বড় সুবিধা হলো শক্তির সাশ্রয়। এটি হলো হাইড্রোডাইনামিক্স বা জলগতিবিদ্যার এক অদ্ভুত কৌশল। যখন একটি মাছ সাঁতার কাটে তখন সেটি জলের মধ্যে কিছু ঘূর্ণন বা ওয়েক তৈরি করে যা ঠিক তার পেছনের মাছটির জন্য সাঁতার কাটাকে সহজ করে তোলে। এই কৌশলটি অনেকটা সাইক্লিং বা সাইকেল চালকদের ড্রাফটিং করার মতো। অর্থাৎ তারা সামনের মাছের তৈরি করা জলের নিম্নচাপ অঞ্চলে সাঁতার কাটে ফলে তাদের সাঁতার কাটতে কম শক্তি খরচ হয়। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন যে দলবদ্ধভাবে সাঁতার কাটার ফলে একটি মাছ একা সাঁতার কাটার চেয়ে প্রায় কুড়ি শতাংশ কম শক্তি খরচ করতে পারে। এর মানে হলো তারা একই পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করে অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।

প্রশান্ত মহাসাগরের থাইল্যান্ডের উপসাগরে মাছের একটি ঝাঁক।
ছবি: কেটিভিএকজিএক।

এই সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা বা কালেকটিভ ইন্টেলিজেন্স কাজ করে মাত্র তিনটি সহজ নিয়মের ওপর ভিত্তি করে। এই নিয়মগুলো বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশন বা সিমুলেশন মডেলের মাধ্যমে আবিষ্কার করেছেন। প্রথম নিয়মটি হলো সেপারেশন অর্থাৎ প্রতিবেশীকে আঘাত করো না। দ্বিতীয় নিয়মটি হলো অ্যালাইনমেন্ট অর্থাৎ প্রতিবেশীর গতি ও দিক মেলাও এবং তৃতীয় নিয়মটি হলো কোহেশন অর্থাৎ দলের কাছাকাছি থাকো। এই তিনটি সহজ নিয়ম মেনে চললেই হাজার হাজার মাছের স্কুলিং নিখুঁতভাবে সংগঠিত হতে পারে। এই নীতিগুলো এতটাই কার্যকর যে বিজ্ঞানীরা এখন এই স্কুলিং মেকানিজম নকল করে রোবোটিক্স বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে ব্যবহার করছেন। সোয়ার্ম রোবোটিক্স বা দলবদ্ধ রোবট তৈরির ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো প্রয়োগ করা হচ্ছে যাতে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ না করেও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারে।

মাছেদের এই বিশাল দলবদ্ধ চলাচল শুধু প্রকৃতির এক বিস্ময়কর দৃশ্যই নয় এটি হলো জীববিজ্ঞানের এক চরম উৎকর্ষ। এটি প্রমাণ করে যে কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কেবল স্থানীয় সংকেত বা লোকাল কিউ এর ওপর নির্ভর করে কীভাবে জটিল সিস্টেম তৈরি করা যায়। ল্যাটারাল লাইন এবং হাইড্রোডাইনামিক্সের ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে মাছেরা দেখিয়েছে যে একা থাকার চেয়ে দলবদ্ধভাবে থাকা শুধু নিরাপদই নয় বরং অনেক বেশি কার্যকর। সমুদ্রের গভীরে এই নীরব ও দ্রুত গতির সমন্বয় আমাদের দেখায় যে অতি সরল নিয়মও সৃষ্টি করতে পারে বিস্ময়করভাবে জটিল এবং শক্তিশালী ব্যবস্থা।