সূর্য যখন দিগন্তে ডুবে যায়, প্রকৃতির বেশিরভাগ রং তখন অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। আমাদের চেনাজানা বাগান বা বন তখন বিশ্রামে চলে যায়। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই পৃথিবীর কিছু কিছু অংশে শুরু হয় এক নীরব নাটক। দিনভর লুকিয়ে থাকা কিছু ফুল যেন তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষ করে কেবল রাতের আঁধারেই নিজেদের পাপড়ি মেলে ধরে। দিনের আলোয় যারা শুধু একটা সবুজ কুঁড়ি মাত্র, রাতের শিশিরে তাদের থেকেই ভেসে আসে তীব্র মিষ্টি সুগন্ধ। এই বিশেষ ফুলগুলোকে সাধারণত চাঁদনী ফুল বা নাইট ব্লুমিং সেরিয়াস নামে ডাকা হয়। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, কেন এই ফুলগুলো সূর্যের আলো উপেক্ষা করে নিশাচার জীবন বেছে নিল। কেনই বা তারা তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি দিনের বেলায় করে না। এই রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে বিবর্তন এবং পলিনেশন বা পরাগসংযোগে।
দিনের বেলায় বেশিরভাগ ফুল উজ্জ্বল হলুদ, লাল বা বেগুনি রঙ ধারণ করে। এর কারণ হলো তারা মৌমাছি, প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙিন পাখিদের আকর্ষণ করতে চায় যারা দিনের আলোতে সক্রিয় থাকে। কিন্তু কিছু ফুল তাদের পুরো জীবন প্রক্রিয়া সাজিয়েছে তাদের জন্য যারা রাতের অন্ধকারে বিচরণ করে। সহজ কথায় এই ফুলগুলো তাদের পলিনেটর বা পরাগ বহনকারীকে লক্ষ্য করে এক বিশেষ কৌশল নিয়েছে। রাতের অন্ধকারে সক্রিয় থাকে মূলত মথ বা পতঙ্গ এবং বাদুড় জাতীয় প্রাণী। এই নিশাচার প্রাণীরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে তাই দিনের আলোয় ফুল ফুটে থাকলে তা কেবল শক্তির অপচয় হতো। ফুল ফোটার কাজটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য তাই ফুলগুলো অপেক্ষা করে সেই সঠিক সময়ের জন্য যখন তাদের মনোনীত অতিথিরা আসবে। বিবর্তনের এই অনন্য কৌশলের ফলেই তারা দিনের আলোয় ফুটতে শিখেছে এমন সব ফুল থেকে নিজেদের আলাদা করে নিয়েছে।
রাতের পরিবেশে নিজেদের পরাগ বহনকারীকে আকৃষ্ট করার জন্য এই ফুলগুলো কয়েকটি বিশেষ ধরনের প্রাকৃতিক পরিবর্তন এনেছে। প্রথমত তাদের রঙ। দিনের ফুলের মতো এদের উজ্জ্বল রঙের কোনো প্রয়োজন হয় না কারণ অন্ধকারে রঙ দেখা যায় না। তাই রাতের ফুলগুলো সাধারণত সাদা, ক্রিম বা ফ্যাকাশে রঙের হয়। এই সাদা রঙ চাঁদের আলোয় বা নক্ষত্রের সামান্য আভাতেও উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয় যা মথ বা বাদুড়ের চোখে সহজে ধরা পড়ে। দ্বিতীয়ত তাদের সুগন্ধ। দিনের ফুলকে খুঁজে নিতে মৌমাছিরা রঙের সাহায্য নেয় কিন্তু রাতের প্রাণীরা গন্ধের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। তাই রাতের ফুলগুলো তাদের সুগন্ধকে তীব্র ও মিষ্টি করে তোলে যাতে তা অনেক দূর থেকেও মথদের শক্তিশালী অ্যান্টেনা বা শুঁড়কে আকৃষ্ট করতে পারে। ইভিনিং প্রিমরোজ বা নিকোশিয়ানা ফুলের তীব্র সুগন্ধ বাতাসের মাধ্যমে সংকেত পাঠায় যে এখন তাদের নেকটার বা মধু সংগ্রহের সময় হয়েছে।
এই ফুলের ফোটার সময়টিও অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে নিয়ন্ত্রিত। তারা এক ধরনের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি মেনে চলে যাকে সার্কেডিয়ান রিদম বা জৈবিক ছন্দ বলা হয়। এই ছন্দ তাদের বলে দেয় ঠিক কখন দিনের তাপ কমে আসবে এবং রাতের আর্দ্রতা শুরু হবে। চাঁদনী ফুল বা কুইন অফ দ্য নাইট ফুলটির ক্ষেত্রে তো সময়জ্ঞান আরো বেশি নিখুঁত। এটি সাধারণত সূর্যাস্তের পরেই ফোটে এবং সূর্য ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগেই ঝরে যায়। এর মানে হলো পলিনেশন সম্পন্ন করার জন্য তার হাতে সময় থাকে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। কিছু কিছু রাতের ফুল যেমন অ্যামাজোনিয়ান ওয়াটার লিলি বা ভিটোরিয়া ওয়াটার লিলি পলিনেটরের সঙ্গে এমন এক সহ-বিবর্তন বা কো-ইভোলিউশন ঘটিয়েছে যা দেখলে রীতিমতো মুগ্ধ হতে হয়। এই বিশাল আকারের লিলিটি প্রথম রাতে সাদা রঙ নিয়ে ফোটে এবং তীব্র সুগন্ধ ছড়ায় যা এক বিশেষ ধরনের বিটলকে আকৃষ্ট করে। বিটলটি ভিতরে প্রবেশ করার পর যখন পাপড়ি বন্ধ হয়ে যায় তখন পুরো রাত ধরে তার পলিনেশন সম্পন্ন হয়। পরের দিন সকালে পাপড়ি খোলার আগেই ফুলটির রঙ সাদা থেকে গোলাপি বা লাল হয়ে যায় যা দিনের পলিনেটরদের কাছে সংকেত দেয় যে তার কাজ শেষ হয়েছে।
| অন্ধকার পটভূমিতে ফুলের পাশে ভাসছে মথ। Image ম্যাকলম স্কুইল। |
বাদুড়েরা হলো কিছু রাতের ফুলের অন্যতম প্রধান পলিনেটর। বাদুড়দের শক্তির চাহিদা বেশি থাকায় তারা এমন ফুল পছন্দ করে যা আকারে বড় এবং প্রচুর পরিমাণে নেকটার তৈরি করে। ক্যাকটাস এবং কিছু ট্রপিক্যাল ফুলের ক্ষেত্রে বাদুড়ের ভূমিকা অপরিহার্য। এই ফুলগুলো খুব মজবুত হয় যাতে বাদুড়ের লোমশ শরীর বা ডানা লাগলেও পাপড়ি ছিঁড়ে না যায়। অন্যদিকে মথ বা পতঙ্গেরা ছোট হয় এবং তাদের লম্বা শুঁড় থাকে যা দিয়ে তারা গভীর এবং সরু নলাকার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে পারে। প্রতিটি রাতের ফুলই যেন তাদের বিশেষ অতিথিদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা এক অভ্যর্থনা কক্ষ। এই ফুলগুলো আমাদের পরিবেশের এমন এক নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা আমরা দিনের আলোয় কখনোই দেখতে পাই না।
সুতরাং কিছু ফুল রাতে ফোটে কারণ তারা তাদের পরাগ বহনের দায়িত্ব রাতের অতিথিদের হাতে সঁপে দিয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত এবং কার্যকরী বিবর্তনীয় কৌশল যা নিশ্চিত করে যে সীমিত শক্তি সবচেয়ে সঠিক সময়ে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাতের বাগানের এই নীরব সৌন্দর্য আসলে প্রকৃতির এক সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং যা শেখায় কীভাবে সহযোগিতা আর সময়জ্ঞান ব্যবহার করে বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ে জয়ী হওয়া যায়। পরের বার চাঁদনী রাতে কোনো ফুলের তীব্র গন্ধ আপনার নাকে এলে বুঝবেন আপনি প্রকৃতির এক গোপন পলিনেশন নাচের সাক্ষী হচ্ছেন।